এক বছরের বেশি বয়সী শিশুরাও নিতে পারবে কলেরার টিকা

ডেস্ক রিপোর্ট

এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও কলেরার টিকা দেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, কলেরা প্রতিরোধে দেওয়া ওরাল ভ্যাকসিনের দুই ডোজের মধ্যে কমপক্ষে দুই সপ্তাহের ব্যবধান রাখতে হবে। টিকা নেওয়ার পর কয়েক বছর পর্যন্ত কলেরা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অডিটোরিয়ামে প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষকে কলেরার টিকা দেওয়া হবে। মন্ত্রী জানান, এবারের ক্যাম্পেইনে ৫০ লাখের বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

শিশুদেরও দেওয়া যাবে টিকা

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের কলেরা প্রতিরোধের এই টিকা দেওয়া যাবে। শিশুদের ক্ষেত্রে টিকার বিষয়ে অভিভাবকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। নির্ধারিত নিয়ম মেনে টিকার ডোজ সম্পন্ন করলে কলেরার বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

তিনি জানান, এই টিকা দুই ডোজে দেওয়া হবে। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার আগে অন্তত দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ, খুব অল্প সময়ের মধ্যে দুই ডোজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নির্ধারিত সময়ের ব্যবধান মেনে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, টিকা নেওয়ার পর অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কলেরা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে। তবে টিকা নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, খাবার ঢেকে রাখা, খাবার তৈরির আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

৫০ লাখের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য

এবারের কলেরা টিকাদান কর্মসূচিতে বড়সংখ্যক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৫০ লাখের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কলেরার ঝুঁকি বেশি, সেসব এলাকার মানুষকে টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কলেরা সাধারণত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি আগে থেকেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, কলেরা প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। টিকা নিলেই সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বরং নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো নিয়মিত মেনে চলতে হবে।

একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে কয়েকটি রোগ

অনুষ্ঠানে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারকে একই সঙ্গে হাম, ডেঙ্গুসহ কয়েকটি রোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন রোগের প্রকোপ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ঢাকায় মশার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আছে

ঢাকায় মশার পরিস্থিতি নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে এখন পর্যন্ত ঢাকায় মশা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মশার বিস্তার কমাতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই বাসাবাড়ির ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন।

নির্ধারিত দিনে দেওয়া হবে টিকার ডোজ

কলেরা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত এলাকাগুলোতে নির্দিষ্ট দিনে টিকা দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে, আগামী ২২ আগস্ট প্রথম ডোজ দেওয়া হবে। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে।

টিকা নিতে আগ্রহীদের সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্র ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। নির্ধারিত বয়সসীমার শিশুদের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে টিকা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাদানের সময় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। দুই ডোজের মধ্যে নির্ধারিত সময়ের ব্যবধান বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজের তারিখ মনে রাখার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

কলেরা প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

কলেরা একটি পানিবাহিত রোগ। দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে এ রোগ হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত ও অতিরিক্ত পানির মতো পায়খানা হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

এ কারণে কলেরার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি পানিশূন্যতা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ পানি পান, খাবার ভালোভাবে সংরক্ষণ, খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে কলেরার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ডেঙ্গু প্রতিরোধেও জনগণের সহযোগিতা চান মন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও সচেতন হতে হবে। নিজের বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন কাজ করছে। তবে নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া এ কার্যক্রম পুরোপুরি সফল করা কঠিন। তাই প্রত্যেক নাগরিককে নিজের দায়িত্ব থেকে কাজ করতে হবে।

বিশেষ করে বর্ষাকালে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে মশার বংশবিস্তার বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরীক্ষা করে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা

প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি কলেরা প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং নগরবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।

কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে কলেরার টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে একই সময়ে কয়েকটি রোগের বিষয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তবে এসব নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দায়িত্বও রয়েছে।

কলেরা প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে নির্ধারিত বয়সের শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে পরিবারগুলোকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে টিকার দুই ডোজের সময়ের ব্যবধান মেনে চলতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে কলেরা, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও কমিয়ে আনা যাবে।

টিকাদান কর্মসূচির নির্ধারিত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২২ আগস্ট প্রথম ডোজ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। এক বছরের বেশি বয়সী শিশুরাও এই কর্মসূচির আওতায় টিকা নিতে পারবে।