উচ্চকক্ষে স্থান চাই শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের

শুধু রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে

সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক আলোচনায় জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, এর স্থায়িত্ব এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কয়েকটি প্রস্তাব উঠে এসেছে। উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি এবং উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ কি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে? নাকি এটি বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আরেকটি সম্প্রসারণ হয়ে থাকবে?

আমাদের মতে, উচ্চকক্ষ গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির জন্য উচ্চকক্ষ গঠন করলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

এই চিন্তা নতুন নয়। ১৯৮০ সাল থেকেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রম-কর্ম-পেশায় নিয়োজিত মানুষসহ বিভিন্ন সামাজিক শক্তির অংশীদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছি। কারণ, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বব্যবস্থা যথাযথভাবে বদলায়নি।

একসময় বাংলাদেশের সমাজ ছিল প্রধানত কৃষিনির্ভর। বর্তমানে কৃষকের পাশাপাশি শিল্পশ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষের অংশগ্রহণে সমাজ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের সমস্যা, অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও প্রত্যাশা আলাদা। অথচ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এসব জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র মতামত ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

বর্তমান সংসদে মূলত ভৌগোলিক নির্বাচনি এলাকার ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার মানুষের সাধারণ নাগরিক সমস্যা ও দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু একজন কৃষকের উৎপাদনসংকট, একজন শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, একজন চিকিৎসকের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা কিংবা একজন শিক্ষকের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সব সময় এলাকার সাধারণ প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে যথাযথভাবে উঠে আসে না।

তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় দুই ধরনের প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি। একটি হবে ভৌগোলিক এলাকার ভিত্তিতে সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অন্যটি হবে পেশা, উৎপাদন ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিশেষ প্রতিনিধিত্ব। নিম্নকক্ষ সাধারণ মানুষের এলাকাভিত্তিক দাবি তুলে ধরবে, আর উচ্চকক্ষ বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক শক্তির স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও প্রত্যাশাকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে যুক্ত করবে।

আমাদের প্রস্তাব হলো, ৩০০ সদস্যের নিম্নকক্ষের পাশাপাশি ২০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন করা। উচ্চকক্ষে শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষক, পেশাজীবী, নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, প্রবাসীসহ বিভিন্ন সামাজিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী নিজেদের নির্বাচকমণ্ডলী থেকে নির্দলীয়ভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সমাজের উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল শক্তির সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। জেএসডির ১০ দফায়ও এ ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু বিশেষ কমিটির আলোচনায় প্রকাশিত একটি প্রস্তাবে ১০৫ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে ৫০ জন সদস্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে, ৫০ জন নিম্নকক্ষে অর্জিত আসনের অনুপাতে এবং পাঁচজন রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা এসেছে। এই পদ্ধতিতে সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু উচ্চকক্ষের মূল ভিত্তি যদি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ফলাফলই হয়, তাহলে এটি নিম্নকক্ষের দলীয় প্রতিনিধিত্বের আরেকটি রূপ হয়ে দাঁড়াবে। এতে শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও অন্যান্য সামাজিক শক্তির স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে না।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কর্মজীবী, পেশাজীবী, নারীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত ভূমিকার কারণেই পরিবর্তনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তাই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নেও তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবর্তনের সংগ্রামে যারা অংশ নিয়েছেন, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াতেও তাঁদের স্থায়ী অংশীদারি থাকা উচিত।

আমরা সংবিধান সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে শ্রম-কর্ম-পেশার মানুষের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব তুলে ধরেছি। আমাদের বিশ্বাস, উচ্চকক্ষকে যদি সত্যিকার অর্থে সমাজের বিভিন্ন শক্তির প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও উচ্চকক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের অধ্যক্ষ হবেন উপরাষ্ট্রপতি এবং উচ্চকক্ষের নির্বাচিত নির্দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। উচ্চকক্ষ একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বহাল থাকলে নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এর কার্যক্রম চলতে পারবে। ফলে নির্বাচিত নির্দলীয় প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এ ব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা, যোগ্যতা, স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট সাংবিধানিক বিধান থাকতে হবে।

এখানে একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। উচ্চকক্ষ যদি রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট বা আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে গঠিত হয়, তাহলে সেটি আবারও দলীয় প্রভাব ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকবে। এমন উচ্চকক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

তাই উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্দলীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী, পেশাজীবী, নারী, প্রবাসী ও অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী যেন নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই নির্বাচন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সংবিধান সংশোধনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, উচ্চকক্ষ গঠনের উদ্দেশ্য শুধু সংসদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি করা নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

উচ্চকক্ষ কাদের প্রতিনিধিত্ব করবে—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি যদি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের আরেকটি ক্ষেত্র হয়, তাহলে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিনিধিত্ব সংকট থেকেই যাবে। আর যদি শ্রম-কর্ম-পেশার মানুষসহ বিভিন্ন সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এটি হতে পারে গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে জনগণের প্রকৃত অংশীদারি নিশ্চিত করতে হবে। তাই উচ্চকক্ষকে দলীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, সমাজের সব উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল শক্তির প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই হবে সময়ের দাবি।