ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলা: ‘মাফিয়া গ্যাংয়ের হেনস্তা প্রমাণ করে তিনি সঠিক পথেই ছিলেন’

বিশেষ প্রতিবেদক

ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের লোকজনের হাতে বাঁধনের হেনস্তার শিকার হওয়াকে তিনি একধরনের অর্জন ও সম্মান হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষায়, একটি ‘মাফিয়া গ্যাংয়ের’ হাতে হেনস্তার শিকার হওয়া প্রমাণ করে বাঁধন সঠিক পথেই ছিলেন।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড ও সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।

বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় ইতালিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ঘটনাটি কোনোভাবেই সরকার ছেড়ে দেবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আজমেরী হক বাঁধনের উদ্দেশে বলব, এটা একধরনের অর্জন, সম্মান প্রাপ্তি যে আওয়ামী লীগের হেনস্তার শিকার হওয়া, একটা মাফিয়া গ্যাংয়ের শিকার হওয়া প্রমাণ করে আপনি সঠিক পথে ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, যারা বাঁধনের ওপর হামলা করেছে, তাদের এক অর্থে ধন্যবাদও দেওয়া উচিত। কারণ, তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ কী ধরনের সংগঠন এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় বলে তিনি মনে করেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগকে তিনি রাজনৈতিক দল হিসেবে মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘ইটস এ মাফিয়া গ্যাং।’ বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাকে তিনি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তাঁর এই বক্তব্যের একটি উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

‘হামলার ঘটনা প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ কী’

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অনেকে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেন এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার থাকার কথা বলেন। কিন্তু বাঁধনের ওপর ইতালিতে যে ধরনের হামলা হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলের আচরণ কি না—সে প্রশ্নও ওঠে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক দল বলে, তাদের রাজনৈতিক একধরনের অধিকার আছে। আজমেরী হক বাঁধনের ওপর যা হলো, আমার মনে হয়—এটা আদৌ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে তাকে কোনোভাবে আমাদের মাটিতে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত হবে কি না।’

তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীর ওপর হামলার ঘটনাকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত হয়রানি হিসেবে দেখছেন না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে বলে তিনি মনে করেন।

সরকার এ ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ইতালিতে হামলার ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার বিষয়টি অনুসরণ করছে এবং কোনোভাবেই হামলাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার পক্ষে নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই এটা ছেড়ে দেব না। এটা কোনোভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।’

শেখ হাসিনার প্রতিও প্রশ্ন

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও তোলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি তাঁর আমলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর জন্য ন্যূনতম দুঃখবোধ করতেন এবং ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফেরার কোনো উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে এ ধরনের সহিংসতা ঘটত না।

জাহেদ উর রহমান শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি যা যা ঘটিয়েছেন, তারপর যদি ন্যূনতম দুঃখবোধ থাকত, রাজনীতিতে ফিরে আসা উদ্দেশ্য থাকত, এই সহিংসতাগুলো করা হতো না।’

তাঁর বক্তব্যে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং ওই সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ও উঠে আসে। সেই আন্দোলনে বাঁধনের সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিনেত্রী যে অভিযোগ করেছেন, সেটিও সংবাদ সম্মেলনে আলোচনায় আসে।


ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলা

এর আগে ইতালিতে হামলা ও হেনস্তার শিকার হওয়ার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। একই সঙ্গে হামলার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেন তিনি।

বাঁধনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে লক্ষ্য করে হামলাকারীরা পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাঁধন বলেন, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বলা হয়। হামলাকারীরা সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও প্রকাশের চেষ্টা করেন।

বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।

ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন মহল থেকে বাঁধনের পাশে দাঁড়ানোর কথাও বলা হয়। বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও অভিনেত্রীর ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

পরিবারের সঙ্গে পার্কে গিয়েই হামলার শিকার

জানা গেছে, সোমবার রাতে ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইতালির একটি স্থানীয় পার্কে গিয়েছিলেন বাঁধন। সেখানেই তাঁর ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে বাঁধন ইতালির মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন। সেখানে যাওয়ার পেছনে রয়েছে তাঁর পেশাগত একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালিতে গেছেন তিনি।

চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন অভিনেত্রী। কিন্তু সোমবার রাতে পার্কে যাওয়ার পর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। একদল লোক তাঁকে ঘিরে ধরে এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে বলে অভিযোগ করেছেন বাঁধন।

পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছোড়ার পাশাপাশি তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন অভিনেত্রী।

ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে বাঁধনের অভিযোগ। এতে বিষয়টি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।


‘আমাকে দমানো সহজ নয়’

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন বাঁধন। তিনি জানিয়েছেন, এ ধরনের হামলা বা ভয় দেখিয়ে তাঁকে দমানো সহজ নয়।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। সেই সময় আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ভূমিকার কারণেই এবার বিদেশের মাটিতে তাঁকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, দেশের রাজনৈতিক বিরোধ বা মতপার্থক্য কি বিদেশের মাটিতেও ব্যক্তিগত হামলা ও হয়রানির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে? একজন শিল্পী তাঁর রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থানের কারণে অন্য দেশে গিয়ে হামলার শিকার হলে এর দায় কার—এ নিয়েও আলোচনা চলছে।

তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান অবশ্য ঘটনাটিকে কঠোরভাবে দেখার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার বিষয়টি ছেড়ে দেবে না এবং ইতালিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।


সরকারের কঠোর অবস্থান

বাঁধনের ওপর হামলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ঘটনাটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখা হবে না। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার সেই প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।

জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনাটি শুধু বাঁধনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে যারা দেখেন, তাদেরও ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা বিবেচনা করা উচিত। কারণ, রাজনৈতিক মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে বিদেশে গিয়েও হেনস্তার শিকার হতে হলে সেটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক আচরণ কি না—সে প্রশ্ন তৈরি হয়।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর যে মূল্যায়ন, সেটিকেই আরও স্পষ্ট করে।

তিনি আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি সেই বক্তব্যের একটি প্রমাণ।


ঘটনাটি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া

ইতালিতে হামলার ঘটনার পর সেখানে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা। তবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

সরকার বিষয়টি অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন জাহেদ উর রহমান। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, এ ঘটনা কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া হবে না।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও এ ঘটনায় সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক মতের কারণে কেউ বিদেশে গিয়ে হামলা বা হেনস্তার শিকার হলে রাষ্ট্র কীভাবে তার পাশে দাঁড়াবে, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বাঁধনের ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলায় বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থানও পরিষ্কার হয়েছে।


চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে বাঁধন

অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছেন একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনী রয়েছে।

সিনেমাটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও কলাকুশলীদের অংশ হিসেবে বাঁধনও উৎসবে যোগ দিয়েছেন। এ উপলক্ষে তিনি ইতালিতে যান।

চলচ্চিত্র উৎসবটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। সেখানে বাংলাদেশের সিনেমার প্রদর্শনী এবং বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রীর অংশগ্রহণ দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্যও উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কিন্তু উৎসবে অংশ নেওয়ার সময়ই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার মুখে পড়তে হয়েছে বাঁধনকে। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের খবরের পাশাপাশি হামলার ঘটনাটিও ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে।

মেস্ত্রে শহরে ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ই সোমবার রাতে হামলার ঘটনা ঘটে বলে বাঁধন জানিয়েছেন।


রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে হামলার অভিযোগ

বাঁধনের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি মনে করছেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। ওই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের অবস্থানও আলোচনায় আসে।

বাঁধনও সেই সময় নিজের অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, সেই ভূমিকার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ ও হেনস্তার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ইতালির ঘটনাতেও হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে বাঁধন জানিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ বলেও পরিচয় দিয়েছেন বলে তাঁর দাবি।

তাঁকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে বাঁধনের অভিযোগ। ফলে এটি শুধু মৌখিক হয়রানি ছিল না; বরং ঘটনাটিকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে তাঁকে অপদস্থ করার পরিকল্পনাও ছিল বলে তিনি মনে করছেন।


মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন

ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা আবারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক মতভিন্নতার প্রতি সহনশীলতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

একজন শিল্পী কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করলে তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই মতের কারণে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা বা ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সহিংসতার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বাঁধনের ওপর হামলার মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

তিনি মনে করেন, বাঁধনের ওপর হামলা আওয়ামী লীগের চরিত্র সম্পর্কে একটি বার্তা দেয়। এ কারণে তিনি বাঁধনকে বলেছেন, এই হামলা এক অর্থে তাঁর জন্য ‘অর্জন’ ও ‘সম্মান’—কারণ একটি ‘মাফিয়া গ্যাংয়ের’ হাতে হেনস্তার শিকার হওয়া তাঁর অবস্থানের সঠিকতা প্রমাণ করে।


‘কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না’

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি উপেক্ষা করা হবে না।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা অবশ্যই এটা ছেড়ে দেব না। এটা কোনোভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।’

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকার ঘটনাটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।

এদিকে বাঁধনও হামলার পর নিজের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি জানিয়েছেন, তাঁকে ভয় দেখিয়ে দমানো সহজ নয়।

ফলে ইতালির এই ঘটনা এখন শুধু একজন অভিনেত্রীর ওপর হামলার বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শিল্পীদের ভূমিকা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।


ঘটনার পর নতুন করে আলোচনা

বাঁধনের ওপর হামলার খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাঁর প্রকাশ করা ভিডিওতে হামলার দৃশ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সরকারও এখন বলছে, ইতালিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মন্তব্যের পাশাপাশি দলটির রাজনৈতিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

বাঁধনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার সরকারের সময়কার সহিংসতার প্রসঙ্গও এসেছে।

সব মিলিয়ে ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচিত একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সামনে কী

বাঁধনের অভিযোগের ভিত্তিতে ইতালিতে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হামলাকারীদের শনাক্ত করা, ঘটনার ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই এবং তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি কতটা এগিয়ে নেয়, তা দেখার বিষয়। তথ্য উপদেষ্টা এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছেন, সরকার ঘটনাটি ছেড়ে দিতে চায় না।

অভিনেত্রী বাঁধন বর্তমানে মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন এবং চলচ্চিত্র উৎসবের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। হামলার পরও তাঁর কাজ ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

ইতালির এই ঘটনা একদিকে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

তথ্য উপদেষ্টার ভাষায়, আওয়ামী লীগের লোকজনের হাতে বাঁধনের হেনস্তার শিকার হওয়াই প্রমাণ করে তিনি সঠিক পথে ছিলেন। আর সরকারের অবস্থান হলো—বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং ঘটনার আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।