অর্থনীতিতে মন্দা, তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা ২৬ হাজার কোটি টাকা

ডেস্ক রিপোর্ট

দেশের অর্থনীতিতে এখনো চাপ ও মন্দাভাব রয়েছে। বিনিয়োগে গতি কম, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরেনি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফায় বড় ধরনের বৃদ্ধি ঘটেছে।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। সব খরচ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রণোদনা বোনাস দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার মূল দায়িত্ব মুদ্রানীতি পরিচালনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, তার এত বড় মুনাফা কীভাবে হলো—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করেছে। একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দক্ষভাবে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে সুদ আয় করা। অন্যটি হলো সরকার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দিয়ে সুদ পাওয়া।

গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব বিবরণী অনুমোদন করা হয়।

কীভাবে আয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো মুনাফা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান উদ্দেশ্য নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ হলো দেশের মুদ্রানীতি পরিচালনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা করা।

তবে এসব কাজ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বড় অঙ্কের অর্থ থাকে। সেই অর্থ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে আয়ও করে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ড ও নিরাপদ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়। এসব বিনিয়োগ থেকে সুদ পাওয়া যায়।

আবার দেশের ব্যাংকগুলোতে যখন টাকার সংকট তৈরি হয়, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ধার দেয়। সরকারও বাজেট ঘাটতি মেটাতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। এসব ঋণের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ পায়।

গত অর্থবছরে এই দুই উৎস থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় অঙ্কের আয় হয়েছে।

রিজার্ভ বিনিয়োগে আয় বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বিনিয়োগ থেকে সুদ আয় হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশের বন্ড ও সিকিউরিটিজে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ আয় করেছে ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই খাতে আয় হয়েছিল ৭ হাজার ৭০২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বন্ড ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয় বেড়েছে ৪ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।

এর সঙ্গে কমিশন ও ডিসকাউন্ট বাবদ আরও ২৭৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে এই খাতে আয় ছিল এর চেয়ে অনেক কম।

সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রিজার্ভের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই এ আয় সম্ভব হয়েছে।

সরকারকে ঋণ দিয়েও বড় আয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো সরকারকে ঋণ দেওয়া।

সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হলে সেই ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশীয় উৎস থেকে ঋণ নেয়। এর একটি অংশ আসে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে।

গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের গতি তুলনামূলক কম থাকায় সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন বেড়েছে।

সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেয়। এসব ঋণের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ আয় করে।

একইভাবে, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে যখন তারল্য বা টাকার সংকট তৈরি হয়, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দেয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ হিসেবে পেয়েছে ২১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া কমিশন ও ডিসকাউন্ট বাবদ ৪৩১ কোটি টাকা, লভ্যাংশ হিসেবে ২০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে।

সব মিলিয়ে টাকা ধার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হয়েছে ২২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

তবে আগের অর্থবছরে এই খাতে আয় ছিল ২৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ টাকা ধার দেওয়ার খাত থেকে এবার আয় কিছুটা কমেছে।

তারপরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় মোট আয় বেড়ে গেছে।

মোট আয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব উৎস মিলিয়ে মোট আয় হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা।

এই আয়ের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ, সরকার ও ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়া, কমিশন, ডিসকাউন্ট, লভ্যাংশ এবং বিভিন্ন সেবা ও জরিমানা থেকে পাওয়া অর্থ রয়েছে।

ব্যাংকগুলোর অর্থ স্থানান্তর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ব্যাংকিং অবকাঠামো ব্যবহারের বিপরীতেও নির্ধারিত সেবা মাশুল আদায় করা হয়। এসব থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় হয়।

তবে শুধু আয় করলেই মুনাফা হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও বড় ধরনের পরিচালন ব্যয় রয়েছে।

রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, টাকা ছাপানো, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিভিন্ন দেশে রিজার্ভ রাখা, সোনা সংরক্ষণসহ নানা কাজে বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থ ব্যয় করতে হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচও কম নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয়ের বড় একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় হয়।

রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন দেশে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট হিসাব ও ব্যবস্থাপনার খরচ রয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা বিদেশে সংরক্ষণ করলে তার জন্য ভাড়াও দিতে হয়।

এ ছাড়া দেশের ব্যাংকগুলো যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমা রাখে, তখন নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় সেই অর্থের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদ দিতে হয়।

টাকা ছাপানো এবং নোট ব্যবস্থাপনার খরচও কম নয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভবন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় রয়েছে।

ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়া অর্থের একটি অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সে জন্য সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।

টাকা ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে ৪৭৯ কোটি টাকা। নোট ছাপাতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৯ কোটি টাকা।

সাধারণ ও পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছরে মোট ব্যয় ছিল ৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার ব্যয় কিছুটা কমেছে।

সব খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট আয় হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা।

আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে মুনাফা দাঁড়ায় ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা।

এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ছয় গুণ সমপরিমাণ প্রণোদনা বোনাস দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ বাদ দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

আগের অর্থবছরের তুলনায় এই নিট মুনাফা বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ থাকার মধ্যেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা প্রায় ১৫ শতাংশের মতো বেড়েছে।

অর্থনীতিতে মন্দা, মুনাফা বাড়ল কেন

এখানেই মূল প্রশ্ন। দেশের অর্থনীতিতে যখন বিনিয়োগ কম, শিল্পে ধীরগতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং অনেক ব্যবসায়ী নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা এতটা বাড়ল কেন?

এর বড় উত্তর হলো—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা সরাসরি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতির ওপর নির্ভর করে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা বিপুল অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ করা হয়। সেই বিনিয়োগ থেকে সুদ আসে।

একইভাবে সরকার ও ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়া অর্থ থেকেও সুদ আয় হয়।

ফলে দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ কম থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, টাকা ও রিজার্ভের ব্যবহার পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। সেখান থেকে বিনিয়োগ করলে মুনাফা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

তবে তাঁর মতে, শুধু মুনাফা কত হলো, সেটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।

মুনাফার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব

মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। কোনো কোনো ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মূল দায়িত্ব কতটা পালন করতে পারছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর মতে, কেন এতগুলো ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ল, কীভাবে ব্যাংকিং খাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় মুনাফা ভালো বিষয় হলেও এটি যেন মূল দায়িত্ব পালনের বিকল্প না হয়ে যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার দাবি

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রিজার্ভের দক্ষ ব্যবস্থাপনাই গত অর্থবছরে মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ সাধারণত নিরাপদ ও তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিভিন্ন দেশে বন্ড ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়। এসব বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় বিভিন্ন দেশের নিরাপদ বন্ডে বিনিয়োগ করে আগের চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব হয়েছে।

একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক ও সরকারকে দেওয়া ঋণ থেকেও বড় অঙ্কের সুদ এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই উৎসের কারণে সামগ্রিক আয় বেড়েছে।

তবে তাঁরা এটাও বলছেন, অর্থনীতি গতিশীল হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা এত বেশি নাও হতে পারে।

অর্থনীতি চাঙা হলে কী হবে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে।

দেশের অর্থনীতি যখন ধীরগতির থাকে, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের চাহিদা ও ব্যবহার এক ধরনের অবস্থায় থাকে। সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হলে এবং ব্যাংকগুলোকে বেশি তারল্য সহায়তা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয় বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, অর্থনীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। শিল্পকারখানায় ঋণের চাহিদা বাড়বে। আমদানি ও উৎপাদন বাড়বে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি পরিচালনার ধরনও বদলাতে পারে।

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি মুনাফা সবসময় অর্থনীতির বেশি ভালো অবস্থার লক্ষণ নয়।

বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে বেশি সুদ আয় হওয়ার পেছনে অর্থনীতির দুর্বলতাও ভূমিকা রাখতে পারে।

সামনে নজর ব্যাংকিং খাত ও মূল্যস্ফীতিতে

বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করা।

রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আয় বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো, গ্রাহকের আমানত সুরক্ষিত রাখা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে, সেগুলোর সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।

এ ছাড়া দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি বাড়ানোও জরুরি। কারণ অর্থনীতি চাঙা হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং ব্যাংকিং খাতও শক্তিশালী হবে।

মুনাফার হিসাবের পাশাপাশি দেখতে হবে অর্থনীতির স্বাস্থ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার মুনাফা নিঃসন্দেহে বড় অঙ্কের। রিজার্ভের অর্থ ভালোভাবে বিনিয়োগ করে আয় বাড়ানো এবং সরকার ও ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ঋণ থেকে সুদ পাওয়া—এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার একটি দিক তুলে ধরে।

কিন্তু এই মুনাফাকে দেশের অর্থনীতির সার্বিক সুস্থতার সরাসরি সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ একই সময়ে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ঋণপ্রবাহ কম এবং ব্যাংকিং খাতে নানা সমস্যা রয়েছে।

তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে মূল প্রশ্ন শুধু ‘কত মুনাফা হলো’ নয়। বরং মুদ্রাস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেল, ব্যাংকিং খাতে আস্থা কতটা ফিরল, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা কতটা সমাধান হলো এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি কতটা বাড়ানো গেল—সেটিই হবে বড় বিবেচনার বিষয়।

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বাড়া আর দেশের অর্থনীতি ভালো থাকা—দুটি বিষয় এক নয়। রিজার্ভের অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার করে আয় বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা—নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।