অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় মামলা, শেষবারের মতো বাসায় আনা হয়েছিল তার মরদেহ

বিশেষ প্রতিনিধি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলায় আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

আজ রোববার সকালে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আজ সকালে শেষবারের মতো তাঁর মরদেহ কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসায় নেওয়া হয়। সকাল থেকেই নুরজাহান ভিলার সামনে স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের ভিড় জমে। অপ্রতিমের মরদেহবাহী গাড়ি বাড়ির সামনে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে শোকের আবহ নেমে আসে।

শেষবারের মতো বাড়িতে অপ্রতিম

আজ রোববার সকাল নয়টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহবাহী গাড়ি কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার নুরজাহান ভিলার সামনে পৌঁছায়। এ সময় বাড়ির নিচে অপ্রতিমের স্বজন ও বন্ধুরা অপেক্ষা করছিলেন।

অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে বাড়ির সামনে ভিড় করেন প্রতিবেশীরাও। অনেকেই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

বাড়ির তৃতীয় তলায় তখন আহাজারি করছিলেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম। সন্তানকে হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েন। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

অপ্রতিমের মরদেহ বেশিক্ষণ বাড়িতে রাখা হয়নি। সকাল পৌনে ১০টার দিকে মরদেহবাহী গাড়িটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের উদ্দেশে নুরজাহান ভিলা ছেড়ে যায়।

সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অপ্রতিমের বন্ধু, স্বজন ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন।

প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ আবার গন্ধমতি এলাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হবে।

নিখোঁজের পর ২২ ঘণ্টা

অপ্রতিম গত শুক্রবার দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর সে বাড়িতে ফেরেনি।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিমের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করা হয়। স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছেও তাঁর বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। পুলিশও অপ্রতিমকে খুঁজতে কাজ শুরু করে।

নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন। অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।

উদ্ধার হয়েছে মায়ের আইফোন

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম বাসা থেকে বের হওয়ার সময় যে আইফোনটি সঙ্গে নিয়েছিল, সেটিও পরে উদ্ধার করা হয়েছে। এক কিশোরের কাছ থেকে ওই আইফোন উদ্ধার করা হয়।

আইফোনটি উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছে পুলিশ। অপ্রতিম কীভাবে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে গেল, তাঁর সঙ্গে কারা ছিল এবং কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। তবে তাঁদের নাম বা তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

মামলাটিও করা হয়েছে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে। ফলে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক

অপ্রতিমের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, স্বজন, বন্ধু ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে।

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেন।

সকালে অপ্রতিমের মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে নেওয়ার পর সেখানে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। সহপাঠী ও বন্ধুদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

অপ্রতিমের বন্ধুরা জানান, তাঁর এমন মৃত্যু তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাঁরা তাঁর খোঁজ করছিলেন। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছালে তাঁরা হতবাক হয়ে যান।

পরিবারের পাশে জামায়াত নেতারা

অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে আজ সকালে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা তাঁদের বাড়িতে যান।

সকাল সোয়া ৯টার দিকে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের নেতৃত্বে স্থানীয় নেতারা গন্ধমতির নুরজাহান ভিলায় যান। তাঁরা অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন।

এ সময় কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের মুঠোফোনে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

ফোনে শফিকুর রহমান অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

তদন্তে পুলিশ

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তাঁর মরদেহ কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, কী অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ফোনের সূত্র এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাঁদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং অপ্রতিম কীভাবে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।

এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হলেও তাঁদের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।

সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের নাম অজ্ঞাত রাখা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।

শেষ বিদায়ে স্বজন-বন্ধুরা

অপ্রতিমের মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার খবর পেয়ে সকাল থেকেই নুরজাহান ভিলার সামনে জড়ো হতে থাকেন স্বজন ও বন্ধুরা।

সকাল নয়টার দিকে মরদেহবাহী গাড়ি বাড়ির সামনে পৌঁছানোর পর অনেকে শেষবারের মতো অপ্রতিমকে দেখতে এগিয়ে আসেন। স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

তৃতীয় তলায় অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের কান্না থামছিল না। স্বজনেরা তাঁকে ঘিরে রাখেন। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।

কিছুক্ষণ পর অপ্রতিমের মরদেহ আবার গাড়িতে তোলা হয়। সকাল পৌনে ১০টার দিকে গাড়িটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের উদ্দেশে রওনা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

স্বজনদের একটাই প্রশ্ন

অপ্রতিমের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কীভাবে তিনি লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে গেলেন, কার সঙ্গে ছিলেন এবং সেখানে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন তাঁরা।

পরিবারের সদস্যরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের প্রত্যাশা করছেন।

পুলিশও বলছে, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার কারণ ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আইফোন উদ্ধার এবং তিনজনকে আটকের বিষয়টি তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায়ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজন ও বন্ধুদের কাছে তাঁর শেষ বিদায় ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর।

মরদেহ উদ্ধারের পর আজ সকালেই শুরু হয় তাঁর শেষযাত্রা। প্রথমে বাড়িতে, এরপর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে জানাজা এবং পরে গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্ত এখন কোন দিকে যায় এবং কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা জানতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির জন্য।