হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, কমছে বিচারাধীন মামলাও

ব্যক্তিগত বিরোধ ও অপ্রয়োজনীয় রিট কমানো গেলে মামলার চাপ আরও কমবে: অ্যাটর্নি জেনারেল

ডেস্ক রিপোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে নতুন রিটের চেয়ে নিষ্পত্তি ছিল কম হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয়েছে ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি মামলা।

অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে হাইকোর্টে যতগুলো নতুন রিট মামলা হয়েছে, তার প্রায় দ্বিগুণ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর ফলে জুন শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

বিচারিক শৃঙ্খলা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিগত বিরোধ বা ব্যক্তিস্বার্থের বিষয় নিয়ে সরাসরি রিট করার প্রবণতা কমানো গেলে হাইকোর্টে মামলার চাপ আরও কমবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আদালতের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃত অর্থে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার পাবেন এবং অপ্রয়োজনীয় মামলার সংখ্যাও কমবে।

তিন মাসে ৯ হাজার ৫৯০ রিট নিষ্পত্তি

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি।

বছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি রিট মামলা।

ফলে প্রথম প্রান্তিকে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা নিষ্পত্তির চেয়ে বেশি ছিল।

তবে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই তিন মাসে হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয়েছে ৪ হাজার ৭২৯টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি মামলা।

অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে যতগুলো নতুন রিট মামলা হয়েছে, নিষ্পত্তি হয়েছে তার চেয়ে ৪ হাজার ৮৬১টি বেশি।

এভাবে মামলার নিষ্পত্তি বাড়ায় জুনের শেষে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে। বছরের শুরুতে যেখানে বিচারাধীন রিট মামলা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি, ছয় মাসে তা কমেছে ২ হাজার ৯৬১টি।

বিচারিক শৃঙ্খলা জরুরি

হাইকোর্টে বিপুলসংখ্যক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মামলার সংখ্যা কমাতে হলে আদালতের কার্যক্রমে আরও বেশি বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আদালতে শৃঙ্খলা ফেরানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রিট মামলার সংখ্যা কমে আসবে।

অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, আদালতে শৃঙ্খলা থাকা মানে শুধু মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া নয়; এর মাধ্যমে সঠিক মামলাগুলো সঠিক আদালতে যাওয়ার পথও নিশ্চিত হয়। এতে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পান।

তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে আইনগত প্রতিকারের নির্দিষ্ট পথ থাকলে সেটি অনুসরণ করা জরুরি। সরাসরি হাইকোর্টে রিট করে নিম্ন আদালতের নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে।

জনস্বার্থের নামে ব্যক্তিস্বার্থের রিট

হাইকোর্টে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল জনস্বার্থ মামলার নামে ব্যক্তিস্বার্থে মামলা করার প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন বা জনস্বার্থ মামলার নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থে রিট করা হয়। এসব মামলার মূল উদ্দেশ্য কখনো কখনো আত্মপ্রচারও হতে পারে।

রিট করার পরপরই গণমাধ্যমের সামনে হাজির হওয়ার প্রবণতাকেও তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনস্বার্থে রিটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং এমন কোনো বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া, যার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। ব্যক্তিগত বিরোধকে জনস্বার্থের মামলার রূপ দেওয়া হলে আদালতের সময় ও বিচারিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সরাসরি রিট নয়

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও অনেক মানুষ সরাসরি হাইকোর্টে রিট মামলা করছেন। এর মধ্যে জমি দখল, জমির সীমানা এবং বিল-বাঁওড়ের মতো বিষয় রয়েছে।

এসব বিরোধের জন্য দেশের প্রচলিত আইনে নিম্ন আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আইনি প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করলে মামলার সংখ্যা যেমন বাড়ে, তেমনি বিচারিক ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। প্রত্যেক ধরনের বিরোধের জন্য আদালত ও আইনি প্রতিকারের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা কমাতে হবে।

আপিল বিভাগের রায় মানা বাধ্যতামূলক

রিট মামলার ক্ষেত্রে বিচারিক শৃঙ্খলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন।

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য বাধ্যতামূলক।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কোন ধরনের মামলা হাইকোর্টে রিট হিসেবে গ্রহণ করা যাবে এবং কোন ধরনের মামলা গ্রহণ করা যাবে না—এ বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায় রয়েছে।

তাঁর মতে, এসব রায়ের আলোকে হাইকোর্টে রিট গ্রহণের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। কোনো বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকার পরও ভিন্নভাবে মামলা গ্রহণ বা আদেশ দেওয়া হলে বিচারিক ব্যবস্থায় অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।

বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট প্রসঙ্গ

অ্যাটর্নি জেনারেল উদাহরণ হিসেবে বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট মামলার বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে সরাসরি রিট পিটিশন গ্রহণের বিষয়ে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। তারপরও বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের কিছু বেঞ্চে বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ এবং আদেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি বিচারিক ব্যবস্থায় একটি অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। এই জায়গায় বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয় রিট মামলা কমবে।

তবে রিটের গ্রহণযোগ্যতা সব ক্ষেত্রে মামলার বিষয়বস্তু, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো নির্দিষ্ট মামলায় রিট করা যাবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

সংবিধানে পাঁচ ধরনের রিট

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিতভাবে রিটের পাঁচটি ধরন রয়েছে।

হেবিয়াস করপাস

কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট করা যায়।

এই রিটের মাধ্যমে আদালতের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোন আইনগত ক্ষমতায় আটক রাখা হয়েছে। আইনগত ভিত্তি না থাকলে আদালত তাকে হাজির করার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মুক্তির নির্দেশ দিতে পারেন।

সহজভাবে বলা যায়, বেআইনি আটক থেকে ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষায় এই রিট গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যান্ডামাস

কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি সংস্থা আইন অনুযায়ী যে দায়িত্ব পালনে বাধ্য, তা পালন না করলে ম্যান্ডামাস রিট করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার আইনগত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিতে পারেন।

অর্থাৎ কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী কাজ করার কথা থাকলেও তা না করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ চাওয়া যায়।

সার্টিওরারি

কোনো নিম্ন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা আদেশ দিলে তা পর্যালোচনার জন্য সার্টিওরারি রিটের বিষয় আসতে পারে।

আইনবহির্ভূত বা এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

প্রহিবিশন

কোনো নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা বা কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করলে সেই কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য প্রহিবিশন রিট করা যেতে পারে।

অর্থাৎ কোনো কর্তৃপক্ষ এমন কোনো বিষয় বিচার করতে শুরু করলে, যার বিচার করার আইনগত ক্ষমতা তার নেই, তখন উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া যায়।

কো-ওয়ারেন্টো

কোনো ব্যক্তি আইনগত যোগ্যতা বা বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করলে তার সেই পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা যায় কো-ওয়ারেন্টো রিটের মাধ্যমে।

এই রিটের মাধ্যমে মূলত আদালত পরীক্ষা করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী ওই সরকারি পদে থাকার যোগ্য কি না।

জনস্বার্থের রিটে বড় ভূমিকা

হাইকোর্টের রিট এখতিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ।

বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি তৈরিতে ‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। ওই মামলার রায়ের মাধ্যমে জনস্বার্থে রিটের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়।

এর ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে আদালতের কাছে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জনস্বার্থে রিটের এই সুযোগ গত কয়েক দশকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, নদী রক্ষা, নারী ও শিশুর অধিকারসহ নানা বিষয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল পরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পেয়েছে।

নদী রক্ষায় রিটের ভূমিকা

দেশের নদী রক্ষায় হাইকোর্টের রিট মামলার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।

হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মাধ্যমে দেশের নদীগুলো ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নদী দখল ও দূষণ রোধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার বিষয়েও আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনা এসেছে।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদী ও জলাশয় দখলমুক্ত করার উদ্যোগ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও রিট মামলার মাধ্যমে আদালতের হস্তক্ষেপের নজির রয়েছে।

পাহাড় কাটা ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধেও রিট

পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও রিট মামলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা, পাহাড় কাটা, পরিবেশ দূষণ এবং জলাশয় ভরাটের মতো বিষয় আদালতের নজরে এসেছে রিট মামলার মাধ্যমে।

এসব মামলায় আদালতের আদেশের ফলে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে রিট যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিকার, এসব মামলার মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য

জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও হাইকোর্টে করা রিট মামলার ভূমিকা রয়েছে।

বাজারে ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে।

কোনো একটি মামলার মাধ্যমে আদালতের নির্দেশনা কখনো কখনো শুধু মামলার আবেদনকারী নয়, একই ধরনের সমস্যায় থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্যও কার্যকর হয়েছে।

দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ ও নাগরিক অধিকার

সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো ঘটনায় মানুষের মৃত্যু কিংবা গুরুতর ক্ষতির পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মানবিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও হাইকোর্টের রিট হয়েছে।

এ ছাড়া নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষায়ও রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিকার পাচ্ছেন না, তখন নির্দিষ্ট আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রিটের মাধ্যমে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া যায়।

রিটের উদ্দেশ্য নিয়ে সচেতনতা প্রয়োজন

আইনজীবীদের মতে, রিট হলো নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার একটি পথ। তবে এই সুযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রতিটি ব্যক্তিগত বিরোধ রিটের বিষয় নয়। আবার প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সরাসরি রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। কোনো বিষয়ে অন্য আইনি প্রতিকার কার্যকরভাবে পাওয়ার সুযোগ থাকলে আদালত অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি বিবেচনা করেন।

ফলে রিটের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আদালতে তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে যথাযথ নিম্ন আদালত বা সংশ্লিষ্ট আইনি ফোরামে যাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে।

ছয় মাসে যে চিত্র পাওয়া গেল

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য হাইকোর্টের রিট মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বছরের প্রথম তিন মাসে নতুন রিট মামলা হয়েছে ৪ হাজার ১১২টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ২১৩টি।

কিন্তু দ্বিতীয় তিন মাসে নতুন মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৭২৯টি, আর নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি।

অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিষ্পত্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের চেয়ে অনেক বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

ফলে বছরের শুরুতে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি বিচারাধীন রিট মামলা থাকলেও জুন শেষে তা কমে হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টি।

এতে বোঝা যায়, নতুন মামলা দায়ের অব্যাহত থাকলেও নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো গেলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা মামলার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মামলার জট কমানো

হাইকোর্টে এখনো এক লাখের বেশি রিট মামলা বিচারাধীন। তাই মামলার জট কমানো বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

একদিকে নতুন রিট মামলা গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে কোন মামলা হাইকোর্টে আসার উপযুক্ত এবং কোন মামলা প্রচলিত আদালত বা অন্য ফোরামে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত—সে বিষয়ে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আরও সচেতন হতে হবে।

বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, উচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা এবং ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি পথে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ানো গেলে হাইকোর্টে অপ্রয়োজনীয় মামলার চাপ কমতে পারে।

একই সঙ্গে জনস্বার্থের প্রকৃত বিষয়গুলো যাতে আদালতের নজরে আসে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ রিটের মূল উদ্দেশ্য শুধু মামলা কমানো নয়; সংবিধান ও আইনে সুরক্ষিত অধিকার রক্ষা এবং আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বলছে, হাইকোর্টে রিট মামলা নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে। এখন এই গতি ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন করে অপ্রয়োজনীয় মামলা দায়েরের প্রবণতা কমানো গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরও কমানো সম্ভব হতে পারে।

আর জনস্বার্থের প্রকৃত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে নাগরিক অধিকার, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও আরও কার্যকর হবে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted